কোক স্টুডিও বাংলার সবচেয়ে বেশি ভিউ পাওয়া গানগুলোর একটি হলো নজরুলগীতি—‘বুলবুলি’। গানটি নতুন প্রজন্মের কাছে যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। কিন্তু ‘বুলবুলি’র নতুন সংগীতায়োজন শুনতে শুনতে একটি প্রশ্ন মাথায় আসতেই পারে—গানটির আসল সুর কি এমনই ছিল?

প্রশ্নটি শুধু একটি গানের সুর নিয়ে নয়, বরং এর ভেতর দিয়ে সামনে আসে বাংলা গানের দীর্ঘ বিবর্তনের গল্প।

বাংলা ব্যাকরণ পড়তে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি কথা শুনি—ভাষা নদীর পানির মতো প্রবহমান। সময়ের সঙ্গে ভাষা যেমন বদলায়, তেমনি বদলায় মানুষের গান শোনার অভ্যাস, সংগীতের ভাষা, সুরের ব্যবহার এবং গানকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংস্কৃতিও।

একসময় গান শোনার প্রধান মাধ্যম ছিল রেডিও। এরপর এল ক্যাসেট প্লেয়ার, তারপর সিডি। প্রযুক্তির হাত ধরে সেই যাত্রা পৌঁছাল ইউটিউব, স্পটিফাইসহ বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে। কিন্তু এই পরিবর্তন শুধু গান শোনার মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। একসময় গান ছিল মূলত শোনার অভিজ্ঞতা; মিউজিক ভিডিওর জনপ্রিয়তার সঙ্গে তা হয়ে উঠল দেখারও অভিজ্ঞতা।

যখন গান শুধু শোনা নয়, দেখাও

বিশ্বসংগীতের এই পরিবর্তনের পেছনে টেলিভিশনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে MTV-র ‘Unplugged’ অনুষ্ঠান লাইভ ও অ্যাকুস্টিক পরিবেশনার একটি নতুন নান্দনিকতা জনপ্রিয় করে। এর সঙ্গে মিউজিক ভিডিও সংস্কৃতির বিস্তার গানকে একটি পূর্ণাঙ্গ অডিও-ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতায় পরিণত করে।

বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ে। টেলিভিশনভিত্তিক মিউজিক অনুষ্ঠান, ভিডিও অ্যালবাম এবং ব্যান্ডসংগীত দ্রুত জনপ্রিয় হতে থাকে। গান আর শুধু কোনো শিল্পীর কণ্ঠে শোনা একটি সুর নয়—এর সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে শিল্পীর উপস্থিতি, পোশাক, মঞ্চ, ভিডিও এবং একটি নির্দিষ্ট জীবনযাপনের গল্প।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশগুলোর একটি ছিল বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীত।

ফিডব্যাক, মাইলস, এলআরবি, ওয়ারফেজ কিংবা নগর বাউলের মতো ব্যান্ড তরুণদের সামনে হাজির করেছিল ভিন্ন এক সংগীতভাষা। ‘চলো বদলে যাই’, ‘নীলা’ কিংবা ‘অবাক ভালোবাসা’র মতো গান শহুরে তরুণদের দৈনন্দিন অনুভূতি, প্রেম, হতাশা, স্বপ্ন ও বিদ্রোহের সঙ্গে এক ধরনের নতুন সম্পর্ক তৈরি করে। শুধু গান শোনার অভ্যাসই বদলায়নি; বদলে যেতে শুরু করেছিল গানকে ঘিরে সামাজিক সংস্কৃতিও।

  • গানের সঙ্গে যুক্ত হলো কনসার্ট।
  • ব্যান্ড সংস্কৃতি গড়ে উঠল।
  • নিজস্ব শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি হলো।

গান হয়ে উঠল ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের পাশাপাশি প্রতিবাদ, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন বলার একটি মাধ্যম।

ক্যাসেট থেকে ইন্টারনেট

তবে সংগীতের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি আসে ইন্টারনেটের বিস্তারের সঙ্গে।

দীর্ঘদিন একজন শিল্পীর সামনে আসার জন্য রেকর্ড লেবেল, প্রযোজক, টেলিভিশন কিংবা নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্কের প্রয়োজন হতো। ভালো গান লিখতে বা গাইতে পারলেই যে শ্রোতার কাছে পৌঁছানো যাবে—এমন নিশ্চয়তা ছিল না। ইউটিউব সেই কাঠামোকে অনেকটাই বদলে দেয়।

একজন শিল্পী এখন নিজের গান নিজেই রেকর্ড করতে পারেন, ভিডিও তৈরি করতে পারেন এবং সরাসরি শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। ফলে তৈরি হয় ‘Independent Artist’-এর নতুন সংস্কৃতি। গান প্রকাশের জন্য বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের দরজায় অপেক্ষা করা বাধ্যতামূলক থাকল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম একজন অখ্যাত শিল্পীকেও বড় শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দিল। অর্থাৎ সংগীতের গণতন্ত্রীকরণও ঘটতে শুরু করল।

পুরোনো গান, নতুন সুর

কিন্তু বাংলা গানের বিবর্তনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত অন্য জায়গায়। নতুনের সন্ধানে যেতে গিয়ে বাংলা গান তার পুরোনোকে ফেলে দেয়নি। বরং পুরোনো গানকে নতুন সংগীতায়োজন, নতুন বাদ্যযন্ত্র এবং নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে আবার ফিরিয়ে আনার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। গান বাংলা টেলিভিশনের ‘Wind of Change’, পার্থ বড়ুয়ার বিভিন্ন rearrangement, ‘সিলন মিউজিক লাউঞ্জ’, ‘IPDC আমাদের গান’—এ ধরনের আয়োজনগুলো পুরোনো বাংলা গানকে নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এরপর আসে Coke Studio Bangla। ২০২২ সালে যাত্রা শুরু করার পর প্ল্যাটফর্মটি বাংলা লোকসংগীত, আঞ্চলিক গান, নজরুলগীতি এবং বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সুরকে আধুনিক সংগীতায়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করতে শুরু করে। এখানে মূল আকর্ষণ শুধু নতুন সাউন্ড নয়; বরং পুরোনো ও নতুনের সহাবস্থান।

একটি লোকগানের সঙ্গে ইলেকট্রনিক সাউন্ড যুক্ত হচ্ছে, পুরোনো সুর নতুন বাদ্যযন্ত্রে ফিরে আসছে, আবার কোনো আঞ্চলিক গানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সমকালীন কণ্ঠ ও সংগীতায়োজন। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি পুরোনো গানের পরিবর্তন, নাকি পুরোনো গানকে নতুন করে আবিষ্কার?

কোক স্টুডিওর গল্প আসলে শুধু কোক স্টুডিওর গল্প নয়

২০০৭ সালে ব্রাজিলে Coke Studio-র যাত্রা শুরু হয়। পরে পাকিস্তানে এর বিস্তার দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতাঙ্গনে বিশেষ আলোচনার জন্ম দেয়। পাকিস্তানি লোকসংগীত ও বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী ধারাকে আধুনিক সংগীতায়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে Coke Studio নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্যবাহী সংগীতকে পৌঁছে দেওয়ার একটি জনপ্রিয় মডেল তৈরি করে। এরপর ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এই ফরম্যাট বিস্তৃত হয়। বাংলাদেশের Coke Studio Bangla সেই ধারারই একটি স্থানীয় রূপ, যেখানে বাংলাদেশের নিজস্ব সংগীত ঐতিহ্যকে সমকালীন শ্রোতার কাছে উপস্থাপনের চেষ্টা দেখা যায়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। বাংলা গানের আধুনিকীকরণ মানেই পশ্চিমা সংগীতের অনুকরণ নয়। লালন, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম কিংবা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগান আজও নতুন সংগীতায়োজনে ফিরে আসছে। অর্থাৎ আধুনিক বাংলা গান একই সঙ্গে সামনে এগিয়েছে এবং পেছনেও তাকিয়েছে।

তাহলে কি বদলে গেছে আমাদের রুচি? আজ একজন শ্রোতার playlist-এ পাশাপাশি থাকতে পারে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, লালনগীতি, ব্যান্ডসংগীত, র‍্যাপ, ইন্ডি মিউজিক এবং Coke Studio Bangla। একই মানুষ সকালে রবীন্দ্রসংগীত শুনতে পারেন, দুপুরে কোনো ব্যান্ডের গান, সন্ধ্যায় লালন আর রাতে একটি র‍্যাপ গান।

এই সহাবস্থানই সম্ভবত বাংলা গানের বিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন। কারণ সংগীতের পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়। প্রযুক্তি আমাদের গান শোনার দরজা বড় করেছে; কিন্তু সেই দরজা দিয়ে আমরা কী শুনব, কীভাবে শুনব এবং কোন গানকে নিজেদের গল্প বলে মনে করব—সেটিও সময়ের সঙ্গে বদলেছে।

রেডিও থেকে ক্যাসেট, ক্যাসেট থেকে সিডি, সিডি থেকে MTV, MTV থেকে YouTube, আর YouTube থেকে streaming—প্রতিটি ধাপ সংগীতের মাধ্যম বদলেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বদলেছে শিল্পী ও শ্রোতার সম্পর্ক, গান তৈরির পদ্ধতি, জনপ্রিয়তার সংজ্ঞা এবং নিজের সংস্কৃতিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।

তাই ‘বুলবুলি’র মতো একটি পুরোনো গান যখন নতুন সুর, নতুন সংগীতায়োজন এবং নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে ফিরে আসে, তখন সেটিকে শুধু একটি পুরোনো গানকে নতুন করে গাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো গল্পটি ধরা পড়ে না। এটি আসলে একটি সংস্কৃতির চলমান যাত্রার অংশ।

আমরা কি আধুনিক হওয়ার পথেই আমাদের শিকড়কে নতুন করে আবিষ্কার করছি?

গান বদলাচ্ছে। প্রযুক্তি বদলাচ্ছে। শ্রোতা বদলাচ্ছে। শিল্পীরাও বদলাচ্ছেন। কিন্তু সেই পরিবর্তনের মাঝেও পুরোনো সুরগুলো হারিয়ে যাচ্ছে না। বরং তারা নতুন প্রজন্মের কানে নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসছে।