প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ফুলবাড়ী কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলনের মাধ্যমে দেশের জ্বালানিসংকট মোকাবিলা করা গেলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে তা দেশের জন্যও ইতিবাচক হবে। তবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে গেলে সেখানে বসতবাড়ি ও কৃষিজমির বিষয় রয়েছে। তাই স্থানীয় মানুষের পুনর্বাসন বা ‘সেটেলমেন্টের’ ব্যবস্থা পর্যালোচনা করার পাশাপাশি পরিবেশের বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
ফুলবাড়ী কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জ্বালানিসংকট সমাধানে ফুলবাড়ীর কয়লা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, ফুলবাড়ীতে থাকা কয়লা বিশ্বের অন্যতম উন্নত মানের কয়লা। এটি উত্তোলন করে যদি দেশের জ্বালানিসংকট মোকাবিলা করা যায়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশের জন্যও তা ভালো হবে।
তবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের বসতবাড়ি ও কৃষিজমির বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারের প্রথম দায়িত্ব হবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের কীভাবে পুনর্বাসন করা যায়, তা নিশ্চিত করা। তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি যাতে তাঁদের আয়-রোজগার বন্ধ না হয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় মানুষও যাতে কোনো না কোনোভাবে সেখান থেকে সুবিধা পান, সেই বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, স্থানীয় মানুষের পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনার পাশাপাশি পরিবেশের ওপর প্রকল্পটির প্রভাবও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। এসব বিষয় পর্যালোচনা করেই ফুলবাড়ী কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর আগে সম্পূরক প্রশ্নে সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার বলেন, সরকার সম্প্রতি জ্বালানিসংকট মোকাবিলার জন্য উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উৎপাদনের বিষয়ে আলোচনা করছে। এই পদ্ধতিতে বেশি পরিমাণ কয়লা উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও কৃষিজমি, বসতি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, ফুলবাড়ী প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। জ্বালানিসংকট মোকাবিলা জরুরি হলেও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কারণে যদি কৃষিজমি নষ্ট হয়, হাজার হাজার মানুষ উচ্ছেদ হয় এবং পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন জনগণের জন্য কল্যাণকর হবে না।
এ কারণে সরকারকে আগে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব সমীক্ষা প্রকাশ করতে হবে এবং স্থানীয় জনগণের সম্মতি নিশ্চিত করতে হবে বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চান সাবিকুন্নাহার।
ফুলবাড়ী আন্দোলনের ইতিহাস
২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জি নামের একটি কোম্পানির কয়লা প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের একটি বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে তিনজন নিহত এবং দুই শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন।
এরপর ফুলবাড়ীর পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী পার্বতীপুর, বিরামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের তীব্রতার মুখে ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট সরকার আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নেয় এবং ‘ফুলবাড়ী চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়।
বাপেক্সকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল: প্রধানমন্ত্রী
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিগত স্বৈরাচারের সময়ে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে কার্যত পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান না করা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশে যে জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে, তা থেকে দেশকে বের করে আনতে সরকার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর অংশ হিসেবে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ৩০টি কূপের খননকাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে ১৪০ এমএসসিএডি গ্যাস যুক্ত হয়েছে।
বর্তমানে আরও ৭টি কূপের খননকাজ চলছে। এসব কূপের কাজ শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে আরও ৮৫ এমএসসিএডি গ্যাস যুক্ত হবে। বাকি কূপগুলো খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
দেশীয় গ্যাসের নতুন উৎস অনুসন্ধানের জন্য ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
অফশোর ও অনশোর—উভয় ক্ষেত্রেই গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগ
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এর প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি জানান, সৌর প্যানেল স্থাপনের প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দেশীয় শিল্প এবং দেশে সোলার প্যানেল উৎপাদনের শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে দেশে লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন উৎসাহিত করতে কর মওকুফের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী সংসদকে জানান, আগামী ছয় মাসে যারা রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন, তাদের উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে সরকার কিনবে।
তিনি আরও জানান, সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছাদে সোলার সিস্টেম স্থাপনের জন্য জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি গাইডলাইনও প্রস্তুত করা হয়েছে। সোলারের পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছে।
এসব কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানিসংকট মোকাবিলার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও বাড়ানো সম্ভব হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
নিলোফার চৌধুরীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারের বিষয়ে ওই দিন দুপুরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। লিথিয়াম ব্যাটারির জন্য একটি সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করা হবে এবং এর জন্য একটি ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে।
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ
সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে সরকার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।
এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশে ও বিদেশে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
